জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৪২

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত সংখ্যার পর) : মাই কাঁহা যাওঙ্গি : বিচিত্র এ পৃথিবী, বিচিত্র মানুষের মন, আর বৈচিত্রময় এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রুটিন করা কাজের প্রণালী। কোনদিন হাসপাতালের রুটিন করা কাজের প্রণালী। কোন দিন হাসপাতালে থাকি নি। এই প্রথম আমি হাসপাতালে পদার্পন করি। মনের দরজা আমার খুলে গেল। সেই ১২ নং ওয়ার্ডের ৩নং বেডে আমি স্থঅন পেলাম। প্রথম দিন ঢুকেই আমার মন কেঁদে উঠল। আমার চারিপাশে খালি লোকের দুঃখ, কষ্ট, মৃত্যু আমাকে অস্থির করে তুলল। গৌতম পৃথিবীতে লোকের এত কষ্ট দেখে সহ্য করতে না পেরে সন্ন্যাাস ধর্ম গ্রহণ করে বনে গিয়ে তপস্যা করেছিলেন।
সন্ধ্যার আঁধার যখন নেমে আসে হাসপাতালের বুকে, ভিজিটরা ৪টায় আসে ৬টায় চলে যায়। তখন প্রত্যেক রোগীর মনে নিরানন্দ চলে আসে। প্রত্যেকই দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন প্রিয়জনদের জন্য। আস্তে আস্তে রাত্রি গভীর হতে থাকে। গভীর মানুষের মন গভীরতায় ভরে ওঠে।
সারা রাত্রি নার্স ডাক্তারের আনাগোনা, রোগীদের যাওয়া-আসা, জন্ম-মৃত্যুর তান্ডবলীলা। কেউ এসে ভর্তি হচ্ছে, কেউ মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, আপন প্রিয়জনদের আহাজারি, এসব কিছু এখানকার দৈনন্দিন কর্ম তালিকা।
হাসপাতালে খুব ভোরেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যেত। বারান্দায় কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে বেরাতাম। প্রায়ই দেখতাম ছোট একটি মেয়ে বারান্দায় বসে শিউলী ফুলের মালা গাঁথত। ভারী লোভ হত। কাছে গিয়ে বলতাম খুকী দাও না মালাটা ? সে বলল নেহি নেওঙ্গি, আমি বললাম, দাওনা ? পয়সা দেব। সে বলল মেরি আম্মিকে লিয়ে হার বানায়া, নেহি দেওঙ্গি। ছোট মুখে কথাটা ভারী মিষ্টি শুনতে।
আমি বললাম, তুম কাহাকে ফুল লিয়ে আয়ী ? সে বলল, নিচুঁমে বহুত বহুত আচ্ছি ফুল হ্যায়। সে দিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশে মেঘে মেঘাচ্ছন্ন। বাইরে খুব জোড়ে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছিল। আমরা পেইং বেডের রোগীরা তখন নাস্তা খাচ্ছিলাম। দূর দূরান্ত থেকে একটা করুন কান্না কানে ভেসে আসছে, আর অসীম আকাশের নিঃসান শূণ্যতায় হারিয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ড বয়গুলো কাকে যেন ধমকাচ্ছে, ‘ও’ আব্বু, ‘ও’ আম্মি, মাই কাঁহা যাওঙ্গি, এই বলে ছোট একটি মেয়ে কাঁদছে।
সকাল বেলার নিরব, নিস্তব্ধ, নিঝুম হাসপাতাল ওর কান্নায় যেন বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছে। নার্সদের জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার, কে এমন করে কাঁদছে ? নার্স তখন বলল, মেয়েটি এক অনাথার মেয়ে, ওর বাবা ভিক্ষা করত, রাস্তার পড়ে মরে ছিল। মা-ও হার্ট ডিজিসের রোগী। পথের লোকেরা ওর মাকে এনে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। এখন মরে গেছে, ওর দেখাশুনার কেহ নেই, বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছে। কেউ দাবী না করলে লাশ কাটা ঘরে রেখে দেওয়া হবে, সেখান থেকে ডোম ফেলে দেবে।
“মাই কাঁহা যাওঙ্গি” “মাই কাঁহা যাওঙ্গি” সেই বিরাট বিস্তীর্ণ বিশাল হাসপাতালের মাঝে ঘুরে ফিরে সেই শব্দই হতে লাগল। “মাই কাঁহা যাওঙ্গি”। দুপুর থেকে মেয়েটির আর শব্দ পাচ্ছি না। ওয়ার্ড বয়কে বললাম, ঐ ছোট মেয়েটি কোথায় ? ওয়ার্ড বয় বলল, কোথাও কোন দিকে বোধ হয় চলে গেছে। মনটা আমার ব্যাকুল কান্নায় ভরে উঠল, কোথায় গেল নিঃস্ব মেয়েটি। হয়ত পথে পথে ঘুরছে আর বলছে, “মাই কাঁহা যাওঙ্গি”। যে দ্বীপ জ্বলিবার জন্য হয় তার তেল অল্প হয় না। রাত ভোর জ্বলিয়া তার নির্ব্বন।
(চলবে————-)।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।