ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মুক্তির লক্ষে গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ

কথা উঠতে পারে গ্রামীণ শিল্প কি ও কেন ? অনেকে মনে করেন শিল্প তো শহর এর ব্যাপার, শহর কেন্দ্রিক। গ্রামের মানুষকে নিয়ে এর মধ্যে আবার টনা-টানি কেন ? গ্রামের মানুষ তো থাকবে চাষাবাদ নিয়ে। নতুন বীজ আসুক, সার আসুক, কীটনাশক ধানের ক্ষেতে স্প্রে করা হউক, ট্রাকটারের চাকার স্পর্শে ধন-ধান্যে ভরে উঠুক বাংলার মাটি। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি চালু হউক। এটাই তো তাদের ভাবনা হওয়া উচিত। তবে গ্রামীণ শিল্প আবার কেন ?
প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে, গ্রামীণ শিল্পের সমৃদ্ধি ও বিকাশ চাষের উন্নতি পরীপন্থি নয় বরং পরিপূরক হবে বলে আমার ধারনা। যেমন করে পাঞ্চাবের লুবিয়ানা, অন্দের পশ্চিম গোদাবাড়ী, যেখানে আধুনিক কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি নানা ধরনের অকৃষিগত কাজ কর্ম বেড়েছে। নানা ধরনের শিল্প সামগ্রির উৎপাদন হচ্ছে।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামগুলিতে অকৃষিজীবি বেকার এর সংখ্যা শতকরা ৩৬%। বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাষের জন্য নতুন উপাদান প্রয়োজন যেমন, উন্নত বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবন, কমপোস্ট সার যথা- কেচোসার তৈরী, কীটনাশক তৈরী, কৃষির জন্য ছোট-বড় যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার যা চেষ্টা করলে গ্রামে তৈরীর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব।
গ্রামের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য গ্রামে তৈরী করা সম্ভব এমন জিনিস এর মধ্যে যেমন- কোদাল, কাস্তে, গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরী ও গোবর সার উৎপাদন হতে পারে গ্রামে। এছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- ট্রাকক্টর এর পার্টস, সেচ পাম্প মেরামত ও রক্ষণা-বেক্ষণ এর জন্য ছোট খাটো লেদ ওয়ার্কসপ গ্রাম অঞ্চলেই করা সম্ভব। এছাড়া চাষের পরে মাঠের ফসল নিয়ে যেমন- ধান ভাঙ্গানো, গম ভাঙ্গানো, ধান মারাই, তৈল তৈরী যে গুলি গ্রাম এর পোডাক্ট দিয়ে গ্রামেই করা সম্ভব।
গ্রামের দুই তৃতীয়াংশ সময় গ্রামের বড় অংশের মানুষ এর হাতে কোন কাজ থাকে না। এই ক্ষেত্রে গ্রামীণ শিল্পের প্রসার ও কর্মসংস্থান বাড়াবে গ্রামের শ্রম শক্তিকে উৎপাদনশীল করে তুলতে সক্ষম হলে। এছাড়া গ্রামের মহিলা সম্প্রদায় যাদের রান্না বান্না ও ছেলে, মেয়েদের পরিচর্যার পরে অফুরন্ত সময় কাজ থাকে না। তাদেরকে যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে কুটির শিল্পের জন্য তৈরী করা যায়, তা হলে তাদের পারিবারিক আয় বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও এন,জি,ও সংস্থা কে দিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচী গ্রহণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে গ্রামীণ শিল্প এর বিকাশ নামে সরকারী তহবিল বরাদ্দ দিয়ে এই প্রোগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে গ্রামের সহজাত কুটির শিল্পের কারুকাজপূর্ণ এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই সমস্ত পন্য মার্কেটিং এর জন্য আড়ং এর মতো সরকারী সংস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সরকার যদি চিন, ইন্দোনশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কারু পন্যের ন্যায় গ্রাম কারুপন্যের উৎপাদন করতে সক্ষম হন তা হলে গার্মেন্টস শিল্প এর ন্যায় নতুন এক রফতানি পন্যের বাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব এই বাংলাদেশে।
বর্তমান পাটের বড় বড় শিল্প কারখানা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে মার খাচ্ছে। তদস্থলে গ্রামে গ্রামে পাট দিয়ে বয়ন শিল্প যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা যায় তা হলে পাটের গ্রামীণ রশি সহ বিভিন্ন উপজাত তৈরী করা সম্ভব, যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বিশেষ উল্লেখ্য যে, আমাদের জমি সীমিত, কিন্তু লোকসংখ্যা বাড়ছে। জমি ভাগ হয়ে ছোট ছোট হয়ে পড়ছে। এতে করে টুকরো জমিতে চাষের অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে দুই এক দশকের মধ্যে অবস্থা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। যদিনা এই সমস্ত চাষি পরিবারের এক বড় অংশকে অন্য কাজে এনগেইজ করা না যায়। গ্রাম থেকে শহরে এসেও কাজ পাচ্ছে না। ফেরিওয়ালা, কুলি, ঝি, চাকর এর মতো অনউৎপাদনশীল খাতে কাজ করছে।
কাজেই উপায়টা কী ? গ্রামের উদ্ববৃত্ত মানুষ কে যদি শহরে শিল্পে বা বাজারে ঢুকিয়ে না দেয়া যায়, তাহলে মূলত গ্রমেই এদের কাজের ব্যবস্থা সুযোগ করে দেয়া উচিত। যেহেতু কৃষিতে চাষ এর জমি সীমিত তাই, কর্মসংস্থানের জন্য মুল পথই হলো গ্রামীণ শিল্প। গ্রামীণ শিল্প এর বড় একটা অবদান হবে সমাজ জীবনে বৈচিত্র আনা। তাদের আয়ের উৎস বাড়ানো এবং নতুন চিন্তা ও প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিগোশীত কার্যক্রম একটি বাড়ী একটি খামার কর্মসূচী কে আরো বহুমুখী দ্বারায় সম্প্রসারিত করা। শহরের বৈচিত্র গ্রামের মানুষ এর মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার গ্রাম হবে শহর এই কর্মসূচী হাতে নিয়েছেন। যার ফলে গ্রামের সড়ক অবকাঠামোসহ পরীকল্পিত আবাসন, স্যানিটেশন, সু-পেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সহ গ্রামে অঞ্চলে শতভাগ বিদুৎ সরবরাহ এর কর্মসূচী হাতে নিয়েছেন। যার ফলে গ্রামের শিল্পের বিকাশ এর জন্য শতভাগ প্রি-কন্ডিশন ফুলফিল হয়েছে বলে ধরে নিতে পারি। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ডের সংযোগ যোগাযোগ এর ক্ষেত্রে এক অভূতপবূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে।
এখন আমাদের কর্তব্য হলো পরীকল্পিত উপায়ে গ্রামীণ শিল্প এর বিকাশ কে দ্রুত বেগবান করা। ফলশ্রুতিতে গ্রামীণ শিল্প এর বিকাশ এর অগ্রগতি গ্রামের আর্তসামাজিক, অর্থনৈতিক কাঠামো পাল্টে যাবে।

লেখক : ফজলুল কাদের মজনু
সভাপতি
ভোলা জেলা আওয়ামীলীগ।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।