১৪ টাকার ইনজেকশন ৭শ’তে গায়েব ১১ কোটি

দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ অধিদপ্তরের অধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের কিছু কর্মকর্তা নিজ পকেটের স্বাস্থ্যসেবাতেই অধিকতর আগ্রহী। তাদের লোভের কারণে বাজারদরের চেয়ে শতগুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে কোটি কোটি টাকার ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী। অসাধু কর্মকর্তারা শুধু তাদের পকেট ভারী করতে প্রয়োজন না থাকলেও কিনেছেন দামি যন্ত্রপাতি। সংসদীয় কমিটির বৈঠকসূত্রে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন দুলাল হোসেন ও আসাদুর রহমান

ইটোপোসাইড ১০০ এমজি ইনকেজশনের খুচরা মূল্য ৬০ টাকা। অথচ এটি ১৫০০ টাকা দরে কিনছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃপক্ষ। ৫ হাজার টাকা মূল্যের পাল্স অক্সিমিটার ৪৫ হাজারে এবং ১৪ টাকা মূল্যের অ্যামিকাইসিন ইনজেকশন ৭০০ টাকা দরে কেনা হয়েছে। ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স হারুন এন্টারপ্রাইজ।

জানা গেছে, সিএমএসডির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়ে মাত্রাতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে সরকারের ১১ কোটি ৬৬ লাখ ৫ হাজার টাকা লোপাট করেছে একটি চক্র। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে লোপাটকৃত অর্থ আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছে। গত ২৭ জুন সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির ৭ম বৈঠক থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে

বাজারমূল্য থেকে উচ্চমূল্যে ওষুধ ক্রয়ে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯৫ টাকা এবং বাজারমূল্য থেকে উচ্চমূল্য চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের নামে ৭ কোটি ২৬ লাখ ৪৫ হাজার ২৪০ টাকাসহ মোট ১১ কোটি ৬৬ লাখ ৫ হাজার ৩৫ টাকা লোপাট করা হয়েছে। অনেকটা চুপিসারে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হলেও ২০১৪ সালের মার্চে অডিট করার সময় তা ধরা পড়ে। এর পরই অডিট অধিদপ্তর থেকে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরে ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে লোপাটকৃত অর্থ আদায়ের সুপারিশ জানানো হয়। এর পর ২০১৫ সালের ২০ মে এবং একই বছরের ৫ অক্টোবর তাগিদপত্র পাঠানোর হয়। কিন্তু এসব অর্থ আদায়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তী আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির নথিপত্র পাঠানো হয় একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে। বিষয়টি কমিটির ৭ম বৈঠকে উপস্থাপনের পর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, সিএমএসডি ও সিভিল অডিট একত্রিত হয়ে সভা করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে পিএ কমিটিকে অবহিত করতে নির্দেশ দেয়।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্যাকেজ নং বিএম ১০-এর আওতায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয় এমন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স হারুন এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত প্রতিটি ৫০০ এমজি অ্যামিকাইসিন ইনকেজশন ৭০০ টাকা করে ক্রয় করা হয়েছে। এই ওষুধটির বাজারমূল্য হচ্ছে মাত্র ১৪ টাকা। সিএমএসডি থেকে ওই অর্থবছরেরই অন্য একটি টেন্ডারে ওষুধটি ১৪ টাকা দরে ক্রয় করা হয়।

এ ছাড়া একই প্যাকেজের বিএম ১০-এর আওতায় প্রতিটি ১০০ এমজি ইটোপোসাইড ইনজেকশন ১৫০০ টাকা মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। এই ওষুধটি শাহবাগ ভিআইপি হাউস নামক ফার্মেসিতে ৬০ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে এসব বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনে সরকারের ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯৫ টাকা লোপাট করা হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু ওষুধ ক্রয়ে নয়, যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বাজারমূল্য থেকে অধিক মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। টেন্ডারে প্যাকেজ নং-জেএআইসিএ (লট-১) এর আওতায় মেসার্স প্রোমিক্স লিমিটেড থেকে সিএমএসডি পাল্স অক্সিমিটার প্রতিটি ৪৪ হাজার ৯৫৫ টাকা দরে ক্রয় করেছে। একই পাল্স অক্সিমিটার বাজারে ৫০০০ টাকায় বিক্রি হয়। এই যন্ত্রপাতি বাজারমূল্য থেকে ৮০০ গুণ বেশি দরে ক্রয় করা হয়েছে। বাজারমূল্য থেকে উচ্চমূল্যে চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের নামে ৭ কোটি ২৬ লাখ ৪৫ হাজার ২৪০ টাকা লোপাট করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারি খাতে সব সংগ্রহ জেনেরিক নামে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরাসরি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্রয় করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ ওই নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে সরকারি ও বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ ক্রয় না করে উৎপাদনকারী নয় এমন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমূল্যে ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে; যা জাতীয় ঔষধ নীতি ২০০৫-এর পরিপন্থী। তাই দায় দায়িত্ব নির্ধারণপূর্বক আপত্তিকৃত ১১ কোটি ৬৬ লাখ ৫ হাজার ৩৫ টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা করে তার প্রমাণপত্র অডিট অফিসে পাঠাতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় সিএমএসডি কর্তৃক অধিক মূল্যে ওষুধ কেনার সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন সত্যতা পাওয়া সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স হারুন এন্টারপ্রাইজ থেকে ট্রেজারি চালানোর মাধ্যমে ২০১৪ সালের ২০ মার্চ ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ টাকা আদায় করে।

প্রয়োজন ছাড়াই কেনা হয় ১৮ কোটি টাকার মেশিন

সিএমএসডির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সরকারি অর্থ লোপাট করতে প্রয়োজন ছাড়াই ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ ৫টি হাসপাতালের জন্য ৫টি ইন্ট্রা অপারেটিভ ইমাজিং সিস্টেম মেশিন ১৮ কোটি ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৬ টাকায় ক্রয় করে। এসব মেশিন কার্যকর রাখার জন্য দুজন চিকিৎসক ও একজন প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

দরপত্রের শর্তমতে এসব মেশিন স্থাপনে রুম রিনোভেশন এবং এয়ারকন্ডিশনিং করে দেওয়ার শর্ত থাকলেও তা মানা হয়নি। প্রয়োজন ছাড়া এসব মেশিন ক্রয় করে আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। ২০১৪ সালের অডিট টিমের কাছে এটি ধরা পড়ে। এর পরই অডিট অধিদপ্তর থেকে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরে ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়। পরবর্তী আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির নথিপত্র পাঠানো হয় একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে। বিষয়টি গত ২৭ জুন সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির ৭ম বৈঠকে আলোচনা হয়।

পিএ কমিটির নির্দেশনায় বলা হয়, কমিটির সিদ্ধান্ত পাঠানোর ১৫ কর্ম দিবসের মধ্যে সিএমএসডি, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, লাইন ডিরেক্টর ও সিভিল অডিট কর্মকর্তার বৈঠক করে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিকে জানাতে হবে।
সূত্রে আমাদের সময়

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।