সমন্বয়হীন ডাকসুতে নতুন বিতর্ক জিএস রাব্বানী

নৈতিক স্খলনের দায়ে ছাত্রলীগ থেকে বিতাড়িত নেতা গোলাম রাব্বানী ডাকসুর জিএস থাকতে পারেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টক অব দ্য ক্যাম্পাস’ ছিল প্রশ্নটি। সবাই এর উত্তর খুঁজেছেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছাত্রলীগ এবং ডাকসু উভয়েই কাজ করে। নৈতিক কারণে একটি সংগঠনে অবৈধ হলে একই ব্যক্তি অপরটিতে কিভাবে বৈধ হবেন। কাজেই তিনি ডাকসুতেও আর নেতৃত্ব দেয়ার মতো নৈতিক অধিকার রাখেন না বলে তারা মনে করেন।

এদিকে রোববার ফাঁস হওয়া এক ফোনালাপে জানা গেছে, জাবি শাখা ছাত্রলীগকে এক কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। এর সঙ্গে তিনি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট ছিলেন তার ছেলে, স্বামী, ব্যক্তিগত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক।

ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে জাবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের মধ্যে ফোনালাপের ৬ মিনিট ১১ সেকেন্ডের ওই অডিও ইতিমধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে।

কথোপকথনে ছাত্রলীগের কারা কিভাবে কত টাকা পেয়েছে তাও উঠে এসেছে। তবে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেয়া এবং এর সঙ্গে পরিবারের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন ভিসি।

এছাড়া ডাকসুর নির্বাচিত কমিটি অর্ধেক মেয়াদ পার করলেও এখন পর্যন্ত তাদের অভিষেকই করতে পারেনি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন কোনো কর্মসূচি নিতে পারেনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের ছাত্রছাত্রীদের এই কেন্দ্রীয় সংসদ।

এগুলোই তাদের সমন্বয়হীনতা এবং ডাকসুর নিষ্ক্রিয়তার বড় দৃষ্টান্ত। এ পরিস্থিতির জন্য নেতাদের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, ১১ মার্চের নির্বাচনের পর ২৩ মার্চ ডাকসুর প্রথম কার্যকরী সভা হয়। সেই হিসাবে ৬ মাস পেরিয়েছে এই কমিটির বয়স।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই ডাকসু শিক্ষার্থীদের স্বার্থে তেমন কর্মসূচি নিতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, গবেষণা এবং হলে-ক্যাম্পাসে সুষ্ঠুভাবে বসবাসের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারেনি।

এ অবস্থার মধ্যেই নৈতিক স্খলনের দায়ে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানীর নিজ সংগঠন থেকে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার ঘটনাটি নতুন বিতর্ক নিয়ে এসেছে।

এ ব্যাপারে অবশ্য কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি ডাকসুর সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘দুই সংগঠন আলাদা গঠনতন্ত্র মোতাবেক চলে। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র মোতাবেক একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এখন ডাকসুর ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত হবে সেটা এর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিতে হবে। ডাকসুর গঠনতন্ত্রে কী আছে তা দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আগাম কথা বলা সম্ভব নয়।’ ডাকসুর জিএসের পদত্যাগের ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটা রিলেটিভ (অনুরূপ) বিষয়।

এ ব্যাপারে কথা বলতে যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি জিএস গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে। তবে তারই সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন বলেন, ডাকসুর অবস্থান সব সময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

ডাকসুর সেই স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখার বিষয় আছে। তবে জিএসের বিষয়টি কী হবে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে ডাকসুর সংবিধানে কিছু উল্লেখ নেই।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে এর আগের কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের জানা নেই। তবে যা হবে দলীয় ফোরামে আলোচনা সাপেক্ষেই হবে।

ডাকসুর ১১ পৃষ্ঠার সংবিধান ঘেঁটে দেখা গেছে, নৈতিক স্খলনের দায়ে কোনো নেতাকে অপসারণ বা সরিয়ে দেয়ার কোনো বিধান নেই। তবে এর সর্বশেষ (১৮ নম্বর) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিষয় সম্পর্কে এই সংবিধানে উল্লেখ না থাকলে সে বিষয়ে ডাকসুর সভাপতির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

ওই সংবিধানের ৫(এ) নম্বর ধারা অনুযায়ী ভিসি ডাকসুর সভাপতি। এই ধারায় সভাপতির দায়িত্বের একটি অংশে বলা হয়েছে, ডাকসুর বৃহত্তর স্বার্থে কার্যকরী কমিটির যে কোনো সদস্যকে বরখাস্ত করতে পারবেন। এই ধারায় বৃহত্তর স্বার্থে সভাপতিকে ডাকসু ভেঙে দেয়ার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের নির্বাহী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যেখানে একজন ব্যক্তির ওপর আস্থা হারিয়েছেন সেখানে তাকে শিক্ষার্থীদের আরেক সংগঠনে রাখার কোনো সুযোগ নেই।

ডাকসুর সভাপতির উচিত হবে জিএসকে ডেকে এটা বলা যে, প্রধানমন্ত্রী তোমার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। ডাকসু থেকে তুমি পদত্যাগ করো। জিএস যদি তা না করেন তাহলে উচিত হবে সভাপতির ডাকসুর সংবিধানে দেয়া ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে বরখাস্ত করা।

কেননা বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ডাকসুর সাধারণ সদস্যরা হয়তো অপসারণের দাবি তুলতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে ভিসিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনের ভাষা বুঝতে হবে।

শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই ডাকসুতে : দীর্ঘ ২৯ বছরের অচলাবস্থা ভেঙে গত ১১ মার্চের নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু। সংবিধান অনুযায়ী, ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক সহায়তা ধারণ, একাডেমিক শিক্ষা-অতিরিক্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনাসহ ৫টি উদ্দেশ্য আছে ডাকসুর।

শিক্ষার্থীদের কল্যাণে মোট ৮টি কাজ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, কমনরুম ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া, সাময়িকী প্রকাশ, বিতর্ক-নাটকসহ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। এছাড়া কার্যনির্বাহী কমিটি কর্মসূচি নিতে পারবে।

সূত্র জানিয়েছে, কমিটি কার্যক্রম শুরুর পর শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দৃশ্যমান কার্যক্রম তেমন একটা নিতে পারেনি। গত জুলাইয়ে ‘অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন অন সাইবার সেইফটি অ্যান্ড ৯৯৯’ শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী একটি কর্মশালার আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

উদ্যোগটি নিয়েছিলেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। কিন্তু ডাকসুর জিএস ও এজিএসের (সহ-সাধারণ সম্পাদক) অসহযোগিতার কারণে কর্মশালাটি শেষ পর্যন্ত হয়নি। এ কথা জানিয়েছেন সমাজসেবা সম্পাদক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এভাবে আরও বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েও তা করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে- ৬ মাসেও নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে ব্যর্থতা। এবারের ডাকসুতে ২৫টি পদের মধ্যে ২৩টিই পেয়েছে ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেল।

দুটি পেয়েছে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। উভয় প্যানেলই নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার দিয়েছিল। সেসব ইশতেহার ধরেও কোনো কর্মসূচি নেয়া হয়নি। নির্বাচনে বিভিন্ন ইশতেহারে প্রায় কমন দিকটি ছিল হলে হলে গণরুম সংস্কৃতি তুলে দেয়া।

কিন্তু সেটি এখনও বিদ্যমান। গবেষণা তহবিল বাড়ানো, ফলের জট কমানো ও অল্প সময়ে ফল প্রকাশের ব্যবস্থা, ক্লাসরুম সংকট দূর, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। এসবের কিছুই হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখনও বিআরটিসি থেকে আউট সোর্সিংয়ে নেয়া বাসে চলাচল করেন।

বেশিরভাগ বাসই ভাঙাচোরা। বাসে চলতে গিয়ে কখনও ছাত্রীদের পোশাক ছিঁড়ে যায়, আবার কখনও শিক্ষার্থীদের হাত-পা কাটে। বাদুড় ঝোলা হয়ে চলাচল নিত্যচিত্র। কিন্তু এসব উন্নয়নে শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি ডাকসুর।

নির্বাচিত হওয়ার ৬ মাস পরও দৃশ্যমান তেমন কর্মসূচি না পেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ডাকসুর ব্যাপারে হতাশ। কবি জসীমউদ্দীন হলের ছাত্র আহমদুল হাসান বলেন, ডাকসুর ব্যাপারে তার মতো সব শিক্ষার্থীর বড় একটা প্রত্যাশা ছিল।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রধান সমস্যা দূর করার ব্যাপারে কাজ করতে পারেনি। ডাকসু হওয়ার আগে ও পরের সময়ের মধ্যে মৌলিক কোনো পরিবর্তন তিনি দেখছেন না।

শামসুন্নাহার হলের ছাত্রী মৌসুমী আখতার বলেন, ডাকসুকে আলাদা চিহ্নিত করার মতো কর্মসূচি আমরা পাইনি। সবকিছু যেন আগের নিয়মেই চলছে।

তবে অনেকেই জানিয়েছেন, ডাকসু তেমন কিছু কর্মসূচি নিতে না পারলেও হল সংসদগুলো ছোটখাটো কিছু সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে আছে, হলের খাবারের মান উন্নয়ন, পয়ঃনিষ্কাশনসহ অন্যান্য সমস্যা দূরীকরণে ভূমিকা রাখা।

তবে বিপরীত চিত্রও আছে। কোনো কোনো হলে-ক্যান্টিনে নেতাদের অত্যাচার বৃদ্ধির অভিযোগ আছে। এমন অভিযোগের একটি হচ্ছে বিজয় একাত্তর হলে চাঁদা না পেয়ে ক্যান্টিন পরিচালককে কৌশলে বিতাড়ন।

অবশ্য বিষয়টি প্রমাণিত নয় বলে উল্লেখ করেছেন ওই হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া।

ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানও মনে করেন, ডাকসুর কার্যক্রম থেমে নেই। তিনি রোববার যুগান্তরকে বলেন, ডাকসু অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গত জুলাই-আগস্টে অনেক কাজ করেছে ডাকসু।

লিখিত-অলিখিত নানাভাবে ডাকসু কর্মসূচি দিচ্ছে। আমরা সেসব বিবেচনা করছি।

এ প্রসঙ্গে ভিপি নূরুল হক বলেন, এটা ঠিক যে শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে আমরা কিছু করতে পারিনি। সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলে হলে গণরুম কালচার দূর করতে পারিনি। এটা দূর করতে কর্তৃপক্ষকে আমরা বৈধ শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ করতে বলেছিলাম।

কিন্তু কর্তৃপক্ষ করেনি। আসলে দীর্ঘদিন চলে আসা অপরাজনীতি এর প্রধান কারণ। বিশেষ করে ছাত্রলীগের বড় ধরনের অসহযোগিতা আছে। কেননা, ডাকসুতে তাদের ২৩ জন প্রতিনিধি আছে। তাদের স্বার্থের বাইরে যায়, এমন কিছু তারা করতে চায় না।

শিক্ষক ও হল প্রশাসনের অনেকে ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত নন। সব মিলিয়ে মৌলিক কাজ করা হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন প্যানেলের ইশতেহারটা অনেকটা চটকদার বিজ্ঞাপনের মতো হয়েছে। যেটা ডাকসুর পক্ষে করা সম্ভব নয়, সেটার অঙ্গীকারও করা হয়েছিল।

এজিএস সাদ্দাম হোসেন বলেন, ভিপি ছাত্রলীগকে দায়ী করে যেসব কথা বলছেন, তা নিতান্তই রাজনৈতিক। ছাত্রলীগ ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে কাজ করে। তাদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই ক’মাসে অনেক কাজ হয়েছে। বিভিন্ন আলোচনা সভা হয়েছে। ডাকসু থেকে দাবি তুলে অতিরিক্ত ফি নেয়া বন্ধ করা হয়েছে। কয়েকটি রুটে বাস বেড়েছে।

ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ও ৭ প্রতিনিধিকে অপসারণ করতে ভিপি নূরের চিঠি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত ৭ প্রতিনিধিকে অপসারণ করতে ভিসি ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানকে চিঠি দিয়েছেন ভিপি নূরুল হক নূর।

এতে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম ও একটি হলের ভিপিকেও অপসারণের দাবি জানানো হয়। ডাকসু নির্বাচনের আগমুহূর্তে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩৪ শিক্ষার্থীকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়া ও নেয়ার অভিযোগে তাদের অপসারণ দাবি করা হয়।

এই চিঠিতে ডাকসুর ৭ সদস্যের নাম উল্লেখ থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ভর্তি হওয়া অন্যদেরও ভর্তি বাতিলের বিষয় উল্লেখ করেন ভিপি।

অভিযুক্ত ৮ জন হলেন : ডাকসুর সদস্য নজরুল ইসলাম, মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান, রাকিবুল হাসান রাকিব, নিপু ইসলাম তন্বী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মো. আরিফ ইবনে আলী, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল আহমেদ তানভীর ও স্যার এএফ রহমান হলের ভিপি আবদুল আলীম খান।

ফোনালাপের তথ্য, জাবি ছাত্রলীগকে কোটি টাকা দেন ভিসি : ছাত্রলীগের কারা কিভাবে কত টাকা পেয়েছে তাও উঠে এসেছে কথোপকথনে। তবে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেয়া এবং এর সঙ্গে পরিবারের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন জাবি ভিসি।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সূত্র মতে, ৯ আগস্ট যে চারজন ভিসির বাসায় ‘টাকা বাটোয়ারা’র জন্য গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন।

অডিও শুনে বোঝা যায়, শাখা ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি হামজা রহমান অন্তর রাব্বানীকে ফোন দেন। ফোন রিসিভ করে রাব্বানী বলেন, হ্যালো অন্তর, টাকা নেয়ার সময় কে কে ছিল? তখন অন্তর বলেন, জুয়েল (শাখা সভাপতি), চঞ্চল (সাধারণ সম্পাদক), সাদ্দাম (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক)।

টাকাটা কোথায় বসে দিয়েছে- রাব্বানী জানতে চাইলে অন্তর বলেন, ভিসি ম্যামের বাসায়। অন্তর তখন বলেন, সাদ্দাম ভাই আমার পাশে আছে, কথা বলবে? রাব্বানী সম্মতি দিলে কথা বলা শুরু করেন সাদ্দাম।

তাদের কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হল-

রাব্বানী : কি খবর ভাই?

সাদ্দাম : ভাই খবর তো আমি জানাইছি, খবর তো ভালো না বেশি একটা। আমি তো আপনাকে জানাইছি ভাই আমি, তাজ (নিয়ামুল হাসান তাজ-সহসভাপতি), জুয়েল ও চঞ্চল- এ চারজন ছিলাম ভাই ওই মিটিংয়ের সময় (টাকা নেয়ার সময় ভিসির বাসায়)।

রাব্বানী : ম্যাম তো বলছে এ আন্দোলনও নাকি আমরা করাইছি! আন্দোলন কারা করছে সেটাও তো আমরা জানি না।

সাদ্দাম : বিষয়টা হচ্ছে, উনি ছাত্রলীগের ওপর সবকিছু দিয়া নিজের ফ্যামিলিরে সেভ করতে চাচ্ছে।

রাব্বানী : আচ্ছা, যখন টাকাটা দিছে তখন তুই ছিলি না?

সাদ্দাম : হ্যাঁ, ভাই, আমি ছিলাম।

রাব্বানী : টাকাটা দিছে কিভাবে? ম্যাম নিজেই দিছে, অন্য কেউ ছিল না?

সাদ্দাম : ওখানে হচ্ছে, ভাই, আর কেউই ছিল না। ম্যাম এবং তার পরিবার হচ্ছে, আমাদের সঙ্গে ডিলিংসটা করছে। পরে সে হচ্ছে টাকাটা আমাদের হলে পৌঁছে দিছে।

রাব্বানী : হলে পৌঁছে দিছে টাকা?

সাদ্দাম : হ্যাঁ, হ্যাঁ, একটা গাড়িতে করে এক লোক এসে দিয়ে গেছে।

রাব্বানী : কয় টাকা দিছে?

সাদ্দাম : আমাদের বলছে, এক কোটি। আমরা বাকিটা জানি না। জুয়েল আর চঞ্চলের সঙ্গে আলাদা সিটিং হইতে পারে।

রাব্বানী : আমি শুনলাম, এক কোটি ষাট।

সাদ্দাম : ওইটা ভাই, ষাটেরটা আমরা জানি না। উনি এক কোটি ভাগ করে দিছে। পঞ্চাশ হচ্ছে জুয়েলের, পঁচিশ আমাদের আর পঁচিশ চঞ্চলের।

রাব্বানী : ও, ম্যাডাম এভাবে ভাগ করে দিছে? জুয়েল ভালো ছেলে এজন্য পঞ্চাশ আর চঞ্চল ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে এজন্য পঁচিশ?

সাদ্দাম : হ্যাঁ। চঞ্চল আমাদের তো বাদ দিতে পারে নাই। ঝামেলা এড়ানোর জন্য বা…

রাব্বানী : ও, চঞ্চলের ভাগেরটাই তোরা পাইছস?

সাদ্দাম : হ্যাঁ, চঞ্চলের ওখান থেকেই। আমরা বলছি যে, ২৫ পার্সেন্ট আমাদের দেয়া লাগবে। তারা হচ্ছে ভাই, তাহলে আমাদেরকে না জানায়া তাদেরকে আলাদা ষাট লাখ টাকা দিছে, এটা হইতে পারে।

রাব্বানী : ও, তাহলে তোদেরকে না জানায়া দিছে?

সাদ্দাম : হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা এটা জানি না। আমরা এক কোটির হিসাব জানি।

রাব্বানী : তোমার ম্যাডাম যে আমাদের নাম জড়াইলো এখানে, টাকার ব্যাপারে আমার বা শোভনের কোনো আইডিয়াই তো নাই।

সাদ্দাম : ভাই, উনি খুব নোংরামি করতেছে।

রাব্বানী : আমিও বুঝতেছি। নিজে সেভ হওয়ার জন্য, ফ্যামিলি সেভ করার জন্য। এ ছয়টা কাজ বেসিক্যালি ঠিকাদারদের সঙ্গে ডিল করছে কে?

সাদ্দাম : ভাই, মূলত ডিলটিল করছে তার ছেলে, তার পিএস সানোয়ার ভাই, পিডি আর তার স্বামী- এ চারজন।

রাব্বানী : হাজবেন্ড, ছেলে, পিডি (প্রকল্প পরিচালক) নাসির আর পিএস (ভিসির একান্ত সচিব) সানোয়ার? ও তারা আগে থেকে ছয়টা কোম্পানি ঠিক করে রেখেছে?

সাদ্দাম : হ্যাঁ, শুরু থেকেই তারা সব কিছু করছে।

রাব্বানী : টেকনিক্যাল কমিটিতেও ভিসি ছিল? ভিসি তো থাকতে পারে না।

সাদ্দাম : হ্যাঁ, সে ছিল। প্রথমত সে তো সবাইরে ফেরত-টেরত পাঠায়া দিল না! সিডিউল ছিনায়া-টিনায়া নিছিল। পরে হচ্ছে, আমরা বলছি, সবাইরে কিনতে দিতে হবে, সবাইরেই ড্রপ করতে দিতে হবে। তখন হচ্ছে, ড্রপ সবাইরেই করাইছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে, নিজ হাতে সব বিষয়গুলা করছে।

পরে আবার কথা বলবেন বলে রাব্বানী ফোনালাপ শেষ করেন।

যুগান্তরের হাতে আসা এ অডিওটি রাব্বানীর সঙ্গে নিজের কথোপকথন বলে নিশ্চিত করেছেন সাদ্দাম। তবে কবে কথা বলেছে সেটি বলতে না পারলেও হামজা রহমান অন্তরের ফোনে কথা বলেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

শাখা ছাত্রলীগের এক কোটি টাকা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার রাতে মুঠোফোনে সাদ্দাম যুগান্তরকে বলেন, ‘সেটি আমার সঠিক মনে পড়ছে না। টাকা নেয়ার বিষয়টি মনে করে তারপর নিশ্চিত করব।’

রাব্বানীর সঙ্গে অনেক কথা হতো উল্লেখ করে সাদ্দাম বলেন, ‘ভাই (রাব্বানী) যেভাবে বলেছে আমরা সেভাবে বলেছি। তার কথামতো করেছি।’ এর কিছুক্ষণ পর সাদ্দাম এ প্রতিবেদকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘টাকা পেয়েছি কিনা সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। তবে ১০ তারিখের (সেপ্টেম্বর) দুপুরের পরের আমার ফোন কল বের করলেই সব ক্লিয়ার হবে।’

এ বিষয়ে জানতে রোববার রাতে জাবি ভিসিকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি অডিওর তথ্যগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, রাব্বানী আমার বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র করছে। অডিওতে অর্থ ভাগবাটোয়ারার যে তথ্য দিয়েছে সেটা বানোয়াট।

আমার পরিবারের যে সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়েছে তাও পুরোপুরি মিথ্যা। রাব্বানী পদ হারিয়ে আমাকে এখন ফাঁসানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে অডিও শুনে কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, এটি ভিসিকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ফাঁস করা হয়েছে।
সূত্রে যুগান্তর

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।