মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি

এবার ধানের উৎপাদন আশাজাগানিয়ার গান শোনালেও, দুঃখ ঘোচেনি কৃষকদের। উৎপাদনকে বলা হচ্ছে বাম্পার। কিন্তু কৃষকদের জীবনে তার কোনো দাগ কাটেনি। আনন্দের যে ঢেউ আমরা ফসলি জমিতে দেখেছি, তার বিন্দুমাত্রও চোখে পড়েনি কৃষকের হেঁসেলে। সবটাই লুট হয়ে গেছে। চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের বিলাসী জীবন আর অহংকারে বেড়ে ওঠা রাজকীয় প্রাসাদে। সামান্য একটি সিস্টেমের অভাবে সব সুখ যেন অবলীলায় চলে যাচ্ছে নিজ গোলা থেকে অন্যের গোলায়। এর একটা বিহিত হওয়া আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমাদের দেশে ধানের উৎপাদক হচ্ছেন কৃষক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই ধান বিক্রি করছেন ফড়িয়ারা। উৎপাদনের চেয়ে সরকারিভাবে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা অনেক কম হওয়ায়, অনেক স্থানে লটারির মাধ্যমে ধান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েও ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রির স্লিপ বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষকরা। মিডিয়া সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, লটারিতে অংশ নেওয়ার জন্য কৃষকদের যে কৃষিকার্ড সরবরাহ করা হয়েছে, তাও ত্রুটিপূর্ণ। নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি নেই, এমন কৃষকরাও পেয়েছেন কৃষিকার্ড। মারা গেছেন, এমন কৃষকও লটারিতে বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া বেশির ভাগ কৃষক তাদের ধান বিক্রির স্লিপ দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ ধান ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিষয়টি খুব জটিল। কৃষকরা যদি তাদের স্লিপ বিক্রি করে দেন, তাহলে তা বের করা খুব কঠিন। অনিয়মের ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায়।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, চলতি বোরো মৌসুমে আদমদীঘি উপজেলায় সরকারিভাবে ৩৬৩ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত হয়। স্বল্প পরিমাণ ধান কেনার লক্ষমাত্রা নির্ধারিত হওয়ায় প্রথম ধাপেই কর্তৃপক্ষকে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। আর এ কারণেই লটারিকেই উত্তম হিসেবে বেছে নেয় ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটি। পাশাপাশি আদমদীঘি উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র মতে, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকায় কৃষক কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ২৭ হাজার। তাদের মধ্য থেকে এক-দুই একর জমি আছে—এমন প্রায় পাঁচ হাজার কৃষককে লটারিতে অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত করা হয়। এর মধ্য থেকে ৩৬৩ জনকে লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত করে প্রত্যেক কৃষককে এক টন ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

বর্তমান সময়ে স্থানীয় হাটে-বাজারে প্রতি মণ চিকন জাতের মিনিকেট, বিআর ২৯ ও কাটারিভোগ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ এবং মোটা জাতের হাইব্রিড জাতের ধান ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে মোটা ধানপ্রতি মণ ১০৪০ টাকা দরে কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। মূল্যের এই ব্যবধানের কারণে ফড়িয়ারা কৃষকদের কাছ থেকে ধান বিক্রির স্লিপ কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এদিকে কৃষিকার্ড তৈরি ও বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যেসব কৃষকের নির্ধারিত পরিমাণ জমি নেই, লটারিতে অধিকাংশই এসেছে তাদের নাম। আমরা ঘর পোড়া গরু, তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে উঠি। আর এ কারণেই বলতে চাই, সরকারি ধান কেনার ব্যাপারে গঠনমূলক একটি নীতিমালা হওয়া আজ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। ধান সংগ্রহের পর মজুদ করার জন্য প্রয়োজনীয় গুদাম তৈরি আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে এবং সময়ের কাজ সময়ে করার বিষয়টিকে দিতে হবে প্রাধান্য। মনে রাখতে হবে, কৃষক না বাঁচলে দেশও বাঁচবে না। সুতরাং; সময় থাকতে সাবধান। মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের হাত থেকে কৃষকদের বাঁচাতে সরকার নিশ্চয়ই জাতিকে কোনো নতুন পথের সন্ধান দেবে—এটাই প্রত্যাশা।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।